হাবিপ্রবি প্রতিনিধি: দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাস রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযম, ধৈর্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা নেয়। সেই সাধনার শেষে ঈদের চাঁদ দেখা মাত্রই চারদিকে যেন এক অন্যরকম আনন্দের আবহ ছড়িয়ে পড়ে। ছোট-বড় সবার মনে তখন উৎসবের উচ্ছ্বাস।
এক ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে শুরু হয় ঈদের সকাল, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে নতুন জামা পরিধান করে নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া। একসাথে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া, যা ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে। নামাজ শেষ কোলাকুলির মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়।
ঈদের সময়ে মানুষ সকল ভেদাভেদ ভুলে নিজেদের মাঝে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করে , ধনীরা দুঃস্থ অসহায়দের সহায়তা করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য ।
ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মিলনমেলা। আর এদিকে ঈদের চাঁদ ওঠা মাত্রই নারীরা ব্যাস্ত হয়ে ওঠেন হাতকে মেহেদীর রঙে রঙিন করতে।কে কার থেকে সুন্দর ডিজাইন করে মেহেদী দিয়ে হাত রাঙাবে এ নিয়ে থাকে এক আলাদা স্নায়ু প্রতিযোগিতা। এ দিন যেন সব পেশার,সব শ্রেণীর মানুষ একই কাঁতারের। সবার বাড়িতেই রান্না হয় লাচ্ছা-সেমাই,পোলাও,মাংস আরো হরেক রকম সুস্বাদু খাবারের।অতিথিপরায়ণে সকলের মন যেন উন্মুখ হয়ে থাকে। এ থেকে বাদ যান না বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। তাদের জন্য ঈদ আনন্দ যেন কিছুটা হলেও ব্যাতিক্রম। রোজার কিছুটা তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটান আবার কিছুটা কাটান নিজ পরিবারের সাথে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, এসাইনমেন্টের ব্যাস্ততা থেকে ঈদে এক লম্বা ছুটি পান তারা। তাই নিজেদের মতো করে শিডিউল করে ঘোরাফেরা করেন এবং অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মো. জুবাইর হাসান ঈদ নিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টদের জন্য ঈদের আগের সময়টা এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির। একদিকে প্রায় একমাস ক্যাম্পাসে রোজা রাখা, ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্ট-মিড-প্রেজেন্টেশন আর পড়াশোনার চাপ; অন্যদিকে ঈদের আগে বাসায় ফেরার জন্য টিকিট সংগ্রহের টেনশন। কখন টিকিট পাবো, ঠিকমতো বাসায় পৌঁছাতে পারবো কি না—এই চিন্তাগুলো সবসময় মাথায় ঘুরতে থাকে।
তারপরও যখন সব ঝামেলা পেরিয়ে অবশেষে বাসায় ফেরা হয়, তখন ঈদের আনন্দটা যেন একটু অন্যরকম লাগে। তবে এখন আগের মতো পুরোটা সময় নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যায় না—মাথার এক কোণে সবসময়ই থাকে পড়াশোনা আর আসন্ন পরীক্ষার চিন্তা। ঢাবিতে ভর্তির পর থেকে এখনো এমন কোনো ঈদ যায়নি যে ঈদের ছুটির পর পরীক্ষা দিতে হয়নি। অন্য সময় বাড়িতে আসলে এতো দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়না। তবুও পরিবারের সাথে কাটানো সেই অল্প সময়টাই ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২-২৩ সেশনের ডিভিএম বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নিহা বলেন, রোজার শেষে আনন্দ, পরিবারের হাসি আর ঈদের ছোট ছোট মুহূর্ত—এটাই আমার ঈদ।ঈদ মানে আমার কাছে অন্যরকম অনুভূতি। ৩০টা রোজা পালনের পর ঈদ তো অন্যরকমই মজা। পুরো রমজান জুড়েই একটা গান কানে বাজতে থাকে “ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। এরপর আসে ঈদ। সেই ছোটবেলা থেকে এখনো আমার একটা প্রধান কাজ ঈদের দিন থাকে—ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নতুন জামা পরে ফেলা, আর তারপর পুরো পরিবারের সবাইকে ঘুরে ঘুরে দেখানো। যেহেতু আমি আমাদের জেনারেশনের মধ্যে সবার ছোট, তাই আমার নতুন জামা পরা দেখেই একরকম আমাদের বাসায় ঈদ শুরু হয়।তারপর রেডি হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকি, আর একটু পরই বসে যাই এটা-ওটা খাওয়ার জন্য। আমাদের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী সকালে মিষ্টি কিছু মুখে দিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া হয়, তাই মিষ্টি দিয়েই সকাল শুরু। তারপর খিচুড়ি বা বিরিয়ানি—এগুলোও ঈদের বড় একটা অংশ।তারপর একটু ঝাল-মশলাদার খেয়ে বেরিয়ে পড়ি সালামি (ঈদি) সংগ্রহ করতে। এটা তো বিশ্বব্যাপী পালিত একটা ট্র্যাডিশন—আর এটাতেই সবচেয়ে বেশি মজা!
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং বিভাগের ২৩ সেশনের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ আনান বলেন, ঈদি জমাতাম কম, খরচ করতাম বেশি—তবু সেই ছোটবেলার ঈদটাই ছিল সবচেয়ে ধনী স্মৃতি!
আগে ছোট বেলায় যেটা করতাম ঈদ সালামি নিয়েই বেশি এক্সাইটেড থাকতাম! চাঁদ রাত থেকে শুরু করে বাজি ফুটানো শুরু। ঈদের দিন সালামি পেয়েই আগে বাজি কিনতে যাইতাম। তারপর আশেপাশে মেলা লাগলে প্রতিবেশীরা মিলে যাইতাম।তবে সালামিতে বেশি ফোকাস থাকতো! আর জমাইতাম কম খাইতাম বেশি।আর রোজার মাস জুড়ে স্টিকারের দোকান তো থাকতোই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২-২৩ সেশনের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আল মুহি ফেরদাউস বলেন,ঈদ আসলে শুধু একটা দিন নয়, এটা হৃদয়ে জমে থাকা এক বিশেষ অনুভূতি!ঈদ মানেই আনন্দ। আর সেই আনন্দের সকালটা শুরু করার জন্য মায়ের হাতের সেমাইয়ের চেয়ে উপযুক্ত কিছু যেন আর হতে পারে না। বাবার সাথে ঈদের নামাজে যাওয়াটাও এই দিনের আলাদা একটা অনুভূতি। নামাজ শেষে সবার সাথে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করা – এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ঈদের আসল সৌন্দর্য।
তবু এই আনন্দের মাঝে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া দাদা–দাদীকে ভুলে যাওয়া হয় না। তাই ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে আমাদের আরেকটা গন্তব্য থাকে, তাদের গোরস্থান। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ঈদের আনন্দের মাঝেও স্মৃতিগুলো সবসময় আমাদের সাথেই থাকে।ঈদের দুপুরটা একেক বছর একেকভাবে কাটে। কখনো নিজের বাসায় জমে ওঠে ঈদের ভোজ, আবার কখনো কারো দাওয়াত রক্ষা করতে অন্য কোথাও যেতে হয়। তবে আমার কাছে ঈদের সবচেয়ে প্রিয় সময়টা হলো বিকাল। তখন যেন চারপাশের পরিবেশেই ঈদের আলাদা একটা আবহ তৈরি হয়। শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক বা ঘুরতে যাওয়ার জায়গাগুলো, সবখানেই নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ানো মানুষদের ভিড়। তাদের হাসিমুখ দেখলেই বোঝা যায়, আজ সত্যিই ঈদ।আমার অবশ্য আরেকটা ছোট্ট শখও আছে। বাসার কাছেই ক্যাম্পাস হওয়ায় ঈদের বিকালের একটা অংশ সেখানে কাটাই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আনন্দের দিনেও ক্যাম্পাসটা তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। সেই নিরিবিলি পরিবেশে পরিচিত জায়গাগুলোকে যেন পুরোপুরি নতুন মনে হয়।
সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে যখন সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরি, তখন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে সত্যিই মনে হয় – হ্যাঁ, আজ ঈদ। চারদিকে সবার হাসিমুখের ছবি, শুভেচ্ছা আর আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখতে ভালো লাগে।
তখন মনে হয়, ঈদ আসলে শুধু একটা দিন না। এটা একটা অনুভূতি। আর সেই অনুভূতির মতোই আনন্দ যেন সবার জীবনে সবসময় থেকে যায়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২-২৩ সেশনের এনভারনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ঐশী বলেন,রোজার ধৈর্যের শেষে যে আনন্দের আলো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয়ে—সেই উৎসবের নাম ঈদ।
ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে খুশি।।। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ এর আনন্দ উপভোগ এর সুযোগ পায় মুসলিমরা। ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের শিক্ষা দেয়। ঈদ আমাদের শেখায় যে, সুখ শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের সাথেও ভাগ করে নিতে হয়।
ঈদ আসার আগে থেকেই মানুষের মধ্যে আনন্দের আমেজ শুরু হয়ে যায়। সবাই নতুন কাপড় কেনে, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে এবং নানা ধরনের খাবার তৈরির প্রস্তুতি নেয়। বিশেষ করে বাচ্চারা ঈদের জন্য অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে।
ঈদ এর দিন সকাল এ মুসুল্লি রা একত্রে নামায আদায় করে। সেমাই পায়েস সহ সুস্বাদু খাবার মজার ও রান্না করা হয় সবার জন্য।
শিশুদের কাছে ঈদ সবচেয়ে আনন্দের দিন। তারা নতুন পোশাক পরে, সালাম করে বড়দের কাছ থেকে সালামি নেয় এবং বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে তাদের আনন্দ আরও বেড়ে যায়।।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ ব্যাচের কম্পিউটার ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের মুশফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আনন্দ আজও আছে, শুধু মানুষ আর মুহূর্তগুলো বদলে গেছে।
ঈদ অর্থ আনন্দ, ঈদ অর্থ খুশি তবে সেই আনন্দ বা খুশি সময়ের সাথে কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো! ঈদে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমার নানি আপুকে যিনি ২০১৫ সালে ইন্তেকাল করেছেন! এছাড়াও আগে ঈদ বলতেই অন্য রকম একটা আনন্দ ছিলো কাজিনরা ঈদের দিনে একত্রিত হওয়া, কার কতো সালামি হয়েছে সেটা হিসাব করা, সালামির টাকা আম্মুর কাছে দেয়া, সালামির জন্য এক আত্মীয়ের বাসা থেকে অন্য আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া এসবের মধ্যেই আনন্দ ছিলো তবে বর্তমানে সেই দিনগুলো আর নেই সবকিছু পরিবর্তন হয়েছে, এখন আর আগের মতো সবার সাথে দেখা হয় না! তবে এই ঈদে ইচ্ছে আছে পরিচিত অনেকের সাথেই দেখা করা খোজ খবর নেয়া ও কুশলাদি বিনিময় করা, এসবের মাঝেই ঈদের আনন্দ খুজে নিতে চেষ্টা করবো!



