ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী: খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন আজ বিশ্বব্যাপী এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব, এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীরব অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক হচ্ছে ভেটেরিনারিয়ানরা। প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতিটি স্তরে ভেটেরিনারিয়ানদের অবদান আজ মানবজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদের ভূমিকা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রোটিন চাহিদা পূরণে দুধ, মাংস ও ডিমের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তবে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হতে পারে। এখানেই ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খামার পর্যায় থেকে শুরু করে বাজার ও ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যের প্রতিটি ধাপে তারা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং সরবরাহ।
প্রাণিস্বাস্থ্যের সুরক্ষা মানেই মানবস্বাস্থ্যের সুরক্ষা—এই সত্য আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে,প্রায় ৭০ শতাংশ সংক্রামক রোগের উৎস বিভিন্ন প্রাণী। বার্ড ফ্লু, নিপাহ, অ্যানথ্রাক্স কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখা যায় না। ভেটেরিনারিয়ানরা এসব জুনোটিক রোগ (যা প্রাণী থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়) প্রতিরোধে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে। তারা টিকাদান কর্মসূচি, রোগ নির্ণয়, নজরদারি কিংবা দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য মহামারিকে আগেই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।ফলস্বরূপ,জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে নিশ্চিত হয়।
এছাড়াও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভেটেরিনারি পেশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) মোকাবিলা। অযথা ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে,২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল এএমআর(AMR)।তথাপি,বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে AMR-এর কারণে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) ১ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ভেটেরিনারিয়ানরা এন্টিবায়োটিকের সঠিক ডোজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইসঙ্গে তারা খামারিদের সচেতন করে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত ওষুধের ব্যবহার বন্ধ হয়।
আমরা অবগত যে,’মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ’—এই তিনটি উপাদান আলাদা নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আধুনিক বিশ্বে স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় “ওয়ান হেলথ” ধারণাটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এই ধারণা বলে, মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে প্রাণী ও পরিবেশের সুস্থতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই ত্রিমুখী সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভেটেরিনারিয়ানরা—যারা নীরবে, নিরলসভাবে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ পেশার সাথে জড়িত মানুষেরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রাণিচিকিৎসা পেশার গুরুত্ব ও অবদানকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষ শনিবার পালিত হয় বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস। দিনটি শুধু প্রাণিচিকিৎসকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং মানবসভ্যতার টেকসই অগ্রযাত্রায় তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
এই দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—ভেটেরিনারিয়ানদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের জন্য নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরী সেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
—স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



