বাকৃবি প্রতিনিধি : আমাদের নিজেদের জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জীবনও সমান মূল্যবান। বিশেষ করে আমরা যারা ভেটেরিনারিয়ান, প্রাণীকে ভালোবাসা এবং তাদের সুস্থ করে তোলা আমাদের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) স্কুল অব ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি এবং ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান এসব কথা বলেন।
শনিবার (১১ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে অ্যানিম্যাল সেভিয়ার্স অব বাংলাদেশ (এএসবি) আয়োজিত ‘বেসিক ট্রেনিং সেশন অন পেট অ্যান্ড স্ট্রে অ্যানিম্যালস: হ্যান্ডলিং, মেডিসিন অ্যান্ড নিউট্রিশন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ড. বাহানুর রহমান বলেন, ‘এনিমেল সেভিয়ার্স অব বাংলাদেশ-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দিত। প্রাণিকল্যাণে এমন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাণীকে ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি একজন ভেটেরিনারিয়ানের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। অসহায় ও আহত প্রাণীর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।’
অনুষ্ঠানে তিনি অ্যানিম্যাল সেভিয়ার্স অব বাংলাদেশ (এএসবি)-এর প্রাণিকল্যাণমূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে সংগঠনটির কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্কুল অব ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি এবং ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুল প্রতীক সিদ্দিকী। বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অ্যানিমেল হেলথ ডিভিশনের হেড অব মার্কেটিং এ.এন.এম. সেলিম হাসান। উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং ভালুকা অঞ্চলের আঞ্চলিক বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বরত জনাব সৈয়দ মাহফুজ আলী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে পাঠ শেষে স্বাগতম বক্তব্যে এএসবি এর সহ-সভাপতি ডা. মো: আল ফারুক মিয়া বলেন, দীর্ঘ দুই বছর কাজ করার পর আমরা ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি নিয়ে আমাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাস্তায় অবহেলা ও দুর্ঘটনার শিকার হওয়া অসহায় পথপ্রাণীদের উদ্ধার করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আমাদের প্রথম কেসটি ছিল রেললাইনে দুই পা হারানো একটি কুকুর ছানার, যার সফল সার্জারি শেষে সে আজ ক্যাম্পাসে সুস্থভাবে বেঁচে আছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উদ্ধারকৃত প্রাণীদের সার্জারি-পরবর্তী নিবিড় পরিচর্যা বা পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারের জন্য আমাদের কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। তাই আমাদের ভেটেরিনারি টিচিং হসপিটালে একটি রুম বরাদ্দ দেওয়া হলে আমরা এই প্রাণীদের আরও সুনিপুণভাবে সুস্থ করে তুলতে পারব। এর পাশাপাশি আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তার জন্য ক্যাচার এবং অ্যান্টি-বাইটিং গ্লাভসের মতো জরুরি রেসকিউ টুলসেরও অভাব রয়েছে।
এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার সৈয়দ মাহফুজ আলী তার বক্তব্যে বলেন, এসকেএফ-এর মূল স্লোগান এক্সিলেন্স থ্রু কোয়ালিটি’। কোয়ালিটির সাথে কোনো আপস না করায় ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে আজ আমরা দেশের এনিমেল হেলথ সেক্টরে ২য় অবস্থানে রয়েছি। এই সাফল্যের মূল কারিগর সম্মানিত চিকিৎসকেরা। আমাদের ভিশন হলো টেকসই ও নিরাপদ প্রোটিন চেইন নিশ্চিত করা।
এএসবি এর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো: মাহবুব আলম বলেন, ২০১৫ সালে চেন্নাই সফরের সময় রাস্তাঘাটের অসুস্থ ও দুর্ঘটনাকবলিত প্রাণীদের প্রতি সাধারণ মানুষের পরম যত্ন ও হসপিটালে পৌঁছে দেওয়ার মানবিকতা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। আমাদের দেশে যখন অবুঝ প্রাণীরা অবহেলা আর অযাচিত আঘাতের শিকার হচ্ছিল, তখন প্রতিবেশী দেশে বিভিন্ন প্রাণকল্যাণমূলক সংগঠনের কার্যক্রম দেখে আমার ভেতরের তাগিদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই প্রেরণা থেকেই ২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের আন্তরিক আগ্রহ ও অনুরোধে আমরা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে অ্যানিমেল সেভারস অফ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করি।
অতিথিদের বক্তব্য শেষে শুরু হয় ট্রেনিং সেশন। পুরো কর্মশালাটি চারটি প্রধান সেশনে বিভক্ত ছিল, যেখানে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকেরা তাদের মূল্যবান বক্তব্য ও পরামর্শ তুলে ধরেছিলেন।
প্রথম অংশে পোষা প্রাণীর হ্যান্ডলিং এবং তাদের মালিকদের সাথে যোগাযোগের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন আবদুর রহমান শাকিল। দ্বিতীয় অংশে শামসুন নাহার ওয়নতি এবং ইন্দ্রানী আদিত্য পোষা প্রাণীর পুষ্টি ও দৈনন্দিন যত্নের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করেন। বিড়াল ও কুকুরের প্রাথমিক চিকিৎসা এবং রোগবালাই নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ডা. সন্দীপ সাহা। এছাড়া পোষা প্রাণীর প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আসেন ডা. আল ফারুক।
প্রশিক্ষণ সেশনে প্রাণিকল্যাণ, দায়িত্বশীল পোষ্য পালন, পথপ্রাণী ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা ও অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের মাঝে প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রাণিসেবায় স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে আগ্রহী তরুণদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উপলব্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা হয়েছে।



