বাকৃবি প্রতিনিধি : কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে এর উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীরা ছিলেন অনিশ্চিত। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভাইরাসটি বাদুর থেকে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাণীর শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং প্রাণীর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক ২০২১ সালে এই বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।
দেশের আটটি জেলার ১,০২৮টি প্রাণীর (গরু, ছাগল, ভেড়া এবং পোষা কুকুর) রক্ত ও নসিকার সোয়াব পরীক্ষা করে এই গবেষকদল। আরটি-কিউপিসিআর এবং অ্যান্টিবডি টেস্ট, উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে এসব নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় কোন নমুনাতেই সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে থাকা এসব গরু, ছাগল, ভেড়া এবং পোষা কুকুর ও বিড়ালের দেহে মেলেনি কোভিড-১৯ এর ভাইরাসটি।
এই ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের গবাদিপশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে আরো বিস্তরভাবে এসব প্রাণিসহ অন্য সব প্রাণিতে গবেষণা চালালে বিষয়টি আরো পরিষ্কার বা নিশ্চিত হবে বলে গবেষকদলটি মতামত দেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন বাকৃবির প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান। গবেষক দলে আরও ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. রোখসানা পারভিন এবং মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুল প্রতিক সিদ্দিক। গবেষণা প্রতিবেদনটি জার্মান জার্নাল অফ মাইক্রোবায়োলজি নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে একটি স্বল্প-প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) অর্থায়নে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী কোভিড-আক্রান্ত পরিবারগুলো চিহ্নিত করে ময়মনসিংহ, ঢাকা, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, বগুড়া, কিশোরগঞ্জ এবং রাজশাহী জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ সময় মোট ৫৫২টি গরু, ১৩৫টি ভেড়া, ১১২টি ছাগল, ১১৮টি বিড়াল এবং ১১১টি কুকুর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৪৬৫টি মলের নমুনা, ৩৬৩টি নাকের সোয়াব এবং ২০০টি রক্তের নমুনা ছিল।
পরীক্ষাগারে এসব নমুনা আরটি-কিউপিসিআর এবং অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। আরটি-কিউপিসিআর পরীক্ষায় চীনের সানশিওর বায়োটেক-এর কিট ব্যবহার করে ভাইরাসের ওআরএফ১এবি এবং এন জিন শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়ার সুজেনটেক-এর এসজিটিআই-ফ্লেক্স আইজিএম/আইজিজি কিট ব্যবহার করে রক্তের সিরামে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি যাচাই করা হয়। সব পরীক্ষায় ফলাফল আসে নেগেটিভ, কোনো নমুনাতেই সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভাইরাসের চরিত্র বদলালে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই তারা গবেষণার ধারাবাহিকতা ও নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন পাশাপাশি, কোভিড আক্রান্ত পরিবারের প্রাণীর সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এই গবেষণা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, পশুপালন এবং মহামারি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ভবিষ্যতের ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এটি একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



